কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ দিলেও চীন, ভারত, কাতার ও ইরাককে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। মার্কিন নৌ অবরোধের মুখে তেহরান এই চার দেশের কাছ থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আমদানি, কূটনৈতিক সমর্থন, ট্রানজিট ফি এবং জ্বালানি বাণিজ্যের বিনিময়ে এই সুবিধা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ওয়াশিংটনের অবরোধ অকার্যকর করার কৌশল নিয়েছে ইরান।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দামের বরাতে জানা গেছে, চীন, ভারত, কাতার ও ইরাকের জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ভারতের কাছ থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী আমদানির নিশ্চয়তা এবং ট্রানজিট ফি আদায়ের শর্তে ভারতীয় জাহাজকে এই ছাড় দেওয়া হয়েছে।
- উপসাগরীয় তেলের প্রায় ৪২ শতাংশ আমদানি করা চীন থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতেই বেইজিংয়ের জাহাজগুলোর জন্য এই পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করলেও চীন, ভারত, কাতার ও ইরাক—এই চার দেশকে বিশেষ ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ অবরোধ ও সম্ভাব্য সামরিক চাপের মধ্যেই এমন সিদ্ধান্তের পেছনে তেহরানের বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দামের বরাতে জানা গেছে, এই চার দেশের জাহাজ বর্তমানে অবাধে হরমুজ প্রণালি পার হতে পারছে। তবে এর বিনিময়ে ইরান প্রতিটি দেশের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট সুবিধা আদায়ের কৌশল নিয়েছে।
দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর তীব্র সংকট রয়েছে। ওষুধ উৎপাদনে ভারত অন্যতম শীর্ষ দেশ হওয়ায়, ইরান নিজেদের জলসীমায় ভারতকে চলাচলের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির নিশ্চয়তা পেতে চাইছে। পাশাপাশি ভারতীয় জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্রানজিট ফিও আদায় করবে তেহরান। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের একতরফা অবরোধ ও চাপ মোকাবিলার জন্য তেহরানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ভরসা বেইজিং। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে চীনের জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতেই হরমুজে তাদের জন্য অবাধ পথ খোলা রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জ্বালানি বাণিজ্যের স্বার্থ; কারণ হরমুজ দিয়ে পার হওয়া উপসাগরীয় তেলের প্রায় ৪২ শতাংশ একাই আমদানি করে চীন। এছাড়া চীনা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকেও ফি পাবে ইরান।
চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের মাধ্যমে নতুন একটি আয়ের উৎস তৈরি করেছে। তবে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী জাহাজের জন্য কোনো ফি নেওয়া হচ্ছে না এবং ইরাকের ক্ষেত্রে ফি নেওয়ার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) যখন ইরানের উপকূলীয় সব বন্দরে কঠোর নৌ অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে, তখন এই চার দেশকে ছাড় দিয়ে মূলত অবরোধকে অকার্যকর করার এবং পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে অর্থনীতি সচল রাখার এক কৌশলী পথ বেছে নিয়েছে তেহরান।
মার্কিন নৌ উপস্থিতি ও সংঘাতের ঝুঁকির মুখে ইরানের এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা সফল হবে, তা ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে। হরমুজ প্রণালির এই ভূরাজনৈতিক চালে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।