ভারতের সঙ্গে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তি না হলে বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলসহ প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও কৃষি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে তৈরি হওয়া এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২.৮ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- আগামী ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে, যার মাধ্যমে ভারত সীমান্তের ২০ কিলোমিটার উজানে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে পানি বন্টন করা হয়।
- বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকাজ টিকিয়ে রাখতে এবং মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে গত মে মাসে সরকার ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার আওতায় ১১৩ মেগাওয়াটের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে।
- ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা শুরুর অনুরোধে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া ৩০ বছর মেয়াদি ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে চলেছে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সরকারের সময় এই চুক্তি সই হয়েছিল, যার মূল ভিত্তি ছিল ভারতের ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা নির্ধারণ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি নবায়ন নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আলোচনা জটিল আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের আশঙ্কা, চুক্তিটি সময়মতো নবায়ন না হলে দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, মৎস্যসম্পদ এবং কৃষি অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি বড় ধরনের অশনিসংকেত।
২ হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা নদী বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অববাহিকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ৬৫ কোটি মানুষের জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু উজান অংশে ভারতের অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর ফলে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সংলগ্ন অঞ্চলের পদ্মা নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ছে এবং বর্ষায় ভাঙন ও বন্যার প্রকোপ বাড়াচ্ছে। ইতিপূর্বে চুক্তি না থাকায় গড়াই নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সুন্দরবনের মিঠা পানির সরবরাহ কমে গিয়েছিল এবং লোনা পানির আগ্রাসন বৃদ্ধি পেয়েছিল। এছাড়া, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতা ৯৫৫ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে বর্তমানে ৫৫০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হিসেবে গত মে মাসে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি নতুন পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ১১৩ মেগাওয়াটের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পানিবণ্টন বিষয়ক কারিগরি কমিটির প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এএফপিকে জানিয়েছেন যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে অবিলম্বে একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করার কথা বললেও ভারত সরকার চুক্তি নবায়নের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান যুগে উভয় দেশেই মিঠা পানির চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমগ্র নদী অববাহিকার বাস্তবতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্যথায়, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পরবর্তী সময়ের চেয়েও ভয়াবহ পানি সংকট তৈরি হতে পারে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝে এই অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংকট নিরসন না হলে তা কেবল পরিবেশগত নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।