‘দুই শতাব্দী’ আগের কাবিননামায় কনের তিন শর্ত
৬০ শব্দের স্মার্ট সারসংক্ষেপ"বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রায় ২০৩ বছরের পুরোনো ফারসি ভাষার একটি কাবিননামায় কনের দেওয়া তিনটি অনন্য শর্তের নজির পাওয়া গেছে। ১৮২৩ সালের অক্টোবরে মুকিমপুরের আফসারুন নেসা খাতুন ও তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর বিয়ের এই দলিলে দ্বিতীয় বিয়ে নিষিদ্ধকরণসহ শারীরিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছিল, যা সেকালের নারীর অধিকার সচেতনতার উজ্জ্বল দলিল।"
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ১৮২৩ সালের অক্টোবরে মুকিমপুরের সৈয়দ নেজাবত আলী চৌধুরীর মেয়ে আফসারুন নেসা খাতুনের সঙ্গে তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর বিয়ে হয়, যার দেনমোহর নির্ধারিত হয়েছিল ৫ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও ৫০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা।
- ঐতিহাসিক কাবিননামার শর্তগুলোতে বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে না করা, একাধারে ছয় মাস স্ত্রীকে ছেড়ে না থাকা এবং মারধরের ক্ষেত্রে শরীরে কোনো দাগ না ফেলার বিধান রাখা হয়েছিল।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান মুমিত আল রশিদের মতে, দলিলে হিজরি ১২ শতকের উল্লেখ থাকায় এটি ১৯২৩ সালের পরিবর্তে ১৮২৩ সালের একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে শতভাগ নিশ্চিত।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলার ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের ৩৩ নম্বর গ্যালারিতে সংরক্ষিত প্রায় ২০৩ বছরের পুরোনো একটি ফারসি ভাষার কাবিননামা দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। ১৮২৩ সালের অক্টোবরে মুকিমপুরের সৈয়দ নেজাবত আলী চৌধুরীর কন্যা আফসারুন নেসা খাতুনের সঙ্গে তালিবাবাদের জমিদার হোসেন উদ্দীন চৌধুরীর এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তৎকালীন অভিজাত সমাজের এই ধুমধামপূর্ণ বিয়ের দলিলে কনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও প্রগতিশীল শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা সেকালের নারী অধিকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিবলিওগ্রাফিক ও ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, কাবিননামায় কনে আফসারুন নেসা খাতুন তিনটি প্রধান শর্তারোপ করেছিলেন। শর্তগুলো হলো—বর্তমান স্ত্রীর লিখিত অনুমতি ছাড়া বর দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না, একাধারে ছয় মাসের বেশি স্ত্রীকে ছেড়ে দূরে থাকতে পারবেন না এবং স্ত্রীর কোনো ত্রুটিজনিত কারণে শারীরিক শাস্তি দেওয়া হলেও শরীরে কোনো দৃশ্যমান দাগ ফেলা যাবে না। তৎকালীন সময়ে জমিদারদের একাধিক বিয়ে ও উপপত্নী রাখার সংস্কৃতি প্রচলিত থাকায় প্রথম স্ত্রীর আইনি সুরক্ষা, দেনমোহর এবং ভরণপোষণ নিশ্চিত করতেই মূলত এই ধরনের লিখিত চুক্তি করা হতো।
এই দলিলে শুধু শর্তই নয়, বরং রেকর্ড পরিমাণ দেনমোহরের তথ্যও পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ ছিল ৫ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং ৫০ হাজার রৌপ্যমুদ্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান মুমিত আল রশিদ জানান, দলিলে হিজরি সাল যুক্ত থাকায় জাদুঘরে প্রদর্শিত ১৯২৩ সালের পরিবর্তে এটি ১৮২৩ সালের দলিল হওয়াই ঐতিহাসিক ও ভাষাগতভাবে যুক্তিসংগত। এদিকে জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনী নথিতে সাল নিয়ে কিছুটা অসংগতি থাকলেও ইতিহাসবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর দলিলটি জাদুঘরে উপহার দিয়েছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম বিবাহ আইনের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনিসুর রহমান জানান, ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন প্রণয়নের আগে কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি কাবিননামার ফরম্যাট ছিল না। তবে সেসময়ে বিত্তশালী ও জমিদার পরিবারগুলো নিজেদের সুরক্ষায় চুক্তিনামার মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত ১৮২৬ সালের আরেকটি কাবিননামায়ও অনুরূপ চারিত্রিক শর্তের উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা তৎকালীন বাংলার সামাজিক বাস্তবতায় নারীর সচেতনতার ঐতিহাসিক দলিল।
এই সংবাদের মূল তথ্য ও স্বত্বাধিকার Prothomalo-এর নিকট সংরক্ষিত। পাঠকদের দ্রুত পাঠযোগ্যতার জন্য বাংলা নিউজ ২৪ সম্পাদকীয় টিম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে।