ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে চীনের বাজারে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা। চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুংকে নিয়ে করা মন্তব্যের পর দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করে এবং একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাতিল করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমবাপে ও ক্লাব কর্তৃপক্ষ ক্ষমা চাইলেও সংকট কাটেনি।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- কিলিয়ান এমবাপের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি স্প্যানিশ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করেছে এবং একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে।
- ২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগার আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মোট মূল্য ছিল ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো, যার একটি বড় অংশ আসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
- রিয়াল মাদ্রিদের মোট জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে, পাশাপাশি হাইসেন্স ও লিংলং টায়ারের মতো চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের স্পনসরশিপ রয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
একটি মন্তব্যের মাশুল কতটা চড়া হতে পারে, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ এবং লা লিগ কর্তৃপক্ষ। ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে চীনের মতো বিশাল ও লাভজনক বাজারে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সংকটে পড়েছে স্প্যানিশ ফুটবল। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করা হয়েছে এবং এমবাপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে একাধিক শীর্ষ চীনা প্রতিষ্ঠান। অথচ সম্প্রচারস্বত্ব, জার্সি বিক্রি ও স্পনসরশিপ মিলিয়ে চীনের বাজার থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে রিয়াল ও লা লিগা। এই পরিস্থিতিতে এমবাপে, তার ক্লাব এবং লিগ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলেও এখনো স্বস্তি মিলছে না। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিতর্কে স্প্যানিশ ফুটবলকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
বিতর্কের মূল সূত্রপাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। সেখানে নিজের মুখ ব্যবহার করে তৈরি একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের নাম উল্লেখ করেন এমবাপে। চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের নায়ক ও দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুংকে নিয়ে প্রকাশ্যে রসিকতা করা বা তাকে অবমূল্যায়ন করা বেইজিংয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফরাসি তারকার এই মন্তব্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চীনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিকতায় দেশটির সবচেয়ে বড় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্প্যানিশ লিগের ম্যাচ দেখানো বন্ধ করে দেয়। লা লিগার একটি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্ব থেকে লিগের আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ২০২৪-২৫ মৌসুমের জন্য ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ইউরো মূল্যের এই আন্তর্জাতিক বাজারের স্থবিরতা লা লিগার অর্থনৈতিক মডেলে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
চীনের বাজারকে প্রাধান্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে লা লিগা কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সাল থেকে চীনা দর্শকদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে ম্যাচের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যার ফলে দর্শক ও সম্প্রচারস্বত্ব দুটেই বৃদ্ধি পায়। এমনকি গত ৩ আগস্ট চায়না মোবাইলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিগুর সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি মৌসুমে ৩৮০টি ম্যাচ দেখানোর নতুন চুক্তি করেছিল লা লিগা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্প্রচার নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শুধু লা লিগাই নয়, রিয়াল মাদ্রিদের বাণিজ্যিক স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত চীনের সঙ্গে। ক্রীড়া দৈনিক মার্কার তথ্য অনুযায়ী, ক্লাবটির মোট জার্সি ও পণ্য বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অর্জিত হয় চীন থেকে। এছাড়া হাইসেন্স, কাইয়ুন স্পোর্টস ও লিংলং টায়ারের মতো প্রভাবশালী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো রিয়ালের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। এমবাপেকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুধু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড নয়, ক্লাবের কর্পোরেট স্বার্থকেও বিপন্ন করে তুলেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এমবাপে, যার পরে রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগাও দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তারা ক্ষমা প্রার্থনাকে বিবেচনায় নিয়েছে, তবে বেইজিংভিত্তিক ক্রীড়া বিশ্লেষক ইয়ান কিয়াং ও অ্যাডাম ঝাংয়ের মতে, কেবল ক্ষমা চাওয়ায় এই সংকটের পূর্ণ সমাধান মিলবে না। ২০১৯ সালে এনবিএর হিউস্টন রকেটস বিতর্কের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের বাজারে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিক ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে। যদিও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি, তবে স্প্যানিশ ফুটবলের বাণিজ্য সাম্রাজ্যে চীনের এই অচলাবস্থা গভীর প্রভাব ফেলবে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।