ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পানি বণ্টনের অমীমাংসিত ইস্যু এবং পরিবেশগত সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ১৯৭৫ সালে চালু হওয়া ফারাক্কা বাঁধ। বাঁধটি নির্মাণের ফলে পদ্মার ভাটিতে বাংলাদেশ যেমন চরম পানি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তেমনি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের নিজস্ব অংশেও পলি জমে মারাত্মক বন্যা এবং নদী ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে, যা দুই পারের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের পানির নায্য হিস্যা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তা নিয়মিত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
- বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারসহ ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে পলি জমে বিহারে মারাত্মক কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি একাধিকবার জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন।
- বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মার শাখা নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়া এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ার মূল কারণ হিসেবে এই বাঁধের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও পরিবেশগত কূটমাূর্তির সবচেয়ে জটিল অধ্যায়গুলোর একটি হলো পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৭৫ সালে ভারত সরকার গঙ্গার পানি ভারতের ভাগীরথী-হুগলি নদীর মাধ্যমে কলকাতার বন্দরের নাব্যতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এই বাঁধ চালু করে। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের জন্যই মারাত্মক মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে এনেছে, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।
১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে) গঙ্গার পানি সমানভাগে বণ্টনের কথা থাকলেও, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে তারা চুক্তিমতো পানির নায্য হিস্যা পাচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিশেষ করে পদ্মা ও তার শাখানদীগুলোতে নাব্য সংকট চরমে পৌঁছেছে। গড়াই নদীর মুখ শুকিয়ে যাওয়ায় কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা ও খুলনা অঞ্চলের সেচ কার্যক্রম মারাত্মভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং সুন্দরবনের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনের ম্যানগ্রোভ ecosystems হুমকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, বাঁধের ভাটি ও উজানের উভয় পারের মানুষই এর মাশুল দিচ্ছে। ভারতের বিহার রাজ্যে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট পলি জমার ফলে মারাত্মক বন্যা দেখা দেয়। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারসহ রাজ্যটির বিভিন্ন নীতিনির্ধারক বহুবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই বাঁধ অপসারণ বা স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পলি জমে গঙ্গার তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদীর দুই তীর প্লাবিত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের টেকসই সমাধান কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের কার্যকর আলোচনার ওপর নির্ভর করছে। কেবল চুক্তি স্বাক্ষর বা মৌখিক আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গঙ্গার অববাহিকা অঞ্চলের সব দেশকে নিয়ে একটি সমন্বিত পানিবণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি। অন্যথায়, দুই পারের সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘমেকানিকাল দুঃখ দুর্দশা এবং পরিবেশগত এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।