চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ একসময়ের ইংরেজ কর্মকর্তা জন কার্টারের স্ত্রীর নামানুসারে ‘খাতুনগঞ্জ’ হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সময়ের পরিক্রমায় ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই বাজারটি বাংলাদেশের পাইকারি ব্যবসার অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে, যেখানে দেশের অর্থনীতিতে চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা জন কার্টারের স্ত্রী খাতুন বিবির নামানুসারে চট্টগ্রামের এই ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্রের নামকরণ করা হয় 'খাতুনগঞ্জ'।
- পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য, মসলা, চাল, ডাল এবং ভোজ্যতেলের পাইকারি ব্যবসার প্রধান হাব হিসেবে খাতুনগঞ্জ দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
- নদীপথে পণ্য পরিবহন সুবিধা এবং সময়ের সাথে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশের ফলে এটি দেশের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যিক বাজারে রূপ নেয়।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ঐতিহাসিক খাতুনগঞ্জ বাজার আজ কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্য কেন্দ্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক ব্রিটিশ কর্মকর্তা জন কার্টার তার স্ত্রীর নামানুসারে এই এলাকায় একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কালক্রমে সেই ‘খাতুন বিবি’র নাম থেকেই এলাকাটি ‘খাতুনগঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায় এবং ক্রমান্বয়ে তা একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক অঞ্চলে পরিণত হয়।
বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকাল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে এই বাজারটি দেশের পাইকারি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। একসময়ে কর্ণফুলী নদীপথে সাম্পান ও বড় নৌকায় করে দূরদূরান্ত থেকে পণ্য আনা-নেওয়া করা হতো। পরবর্তীতে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে সরাসরি পণ্য কেনাবেচা শুরু করেন। চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা এবং বিভিন্ন ধরনের মসলা পণ্যের বিশাল গুদাম ও আড়ত গড়ে ওঠে এই এলাকায়।
দেশের আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের সিংহভাগই এই খাতুনগঞ্জের ওপর নির্ভরশীল। রমজান কিংবা কোরবানি ঈদের মতো বড় উৎসবগুলোতে দেশের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে খাতুনগঞ্জের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বা বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও, দেশের পাইকারি বাজারের মূল্য নির্ধারণে খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য। সোনালি যুগের শেষ পর্বে এসে অবকাঠামোগত কিছু পরিবর্তন ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ছোঁয়া লাগলেও এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া ও অনলাইন ব্যবসার প্রসারে সনাতন পদ্ধতির এই পাইকারি বাজারে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও এর মূল কাঠামোগত গুরুত্ব কমেনি। দেশের কোটি মানুষের নিত্যদিনের খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে খাতুনগঞ্জ আজও সমানভাবে সক্রিয়। তবে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং আধুনিক স্টোরেজ বা কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার ঘাটতির মতো কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্রটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।