চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই সময়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তন, অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনাকে এই বড় ঘাটতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যার বিপরীতে প্রকৃত আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা।
- আদায়ের এই ধীরগতির ফলে সামগ্রিক ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং বছর শেষে ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
- রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের গবেষণা পরিচালক মো. দীন ইসলাম ও সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও ভ্যাট নিয়মের পরিবর্তনকে রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এই তিন মাসে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশেরও কম। অর্থবছরের শুরুতেই এমন বড় ঘাটতি সামগ্রিক ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সক্ষমতাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
রাজস্ব আদায়ের এই ধীরগতির পেছনে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনবিআর কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়ার নিয়ম চালু করায় জুলাই ও আগস্টে অনেক প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়নি, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেপ্টেম্বরের ভ্যাট সংগ্রহে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চলতি মাসের শুরুতে সরকার পুনরায় মাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, কেবল ভ্যাট নীতির পরিবর্তনই একমাত্র কারণ নয়; বরং বর্তমান প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মতৎপরতা ও গতিশীলতার অভাবও এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
রাজস্ব আদায়ে এই বড় ধস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র-পিডিপি) গবেষণা পরিচালক মো. দীন ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, রাজস্ব আয় কমে গেলে সরকারি ব্যয় সীমিত হয়ে যেতে পারে, অথচ এই মুহূর্তে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়াতে পারে, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হবে এবং চড়া সুদের বাজারে উৎপাদনী খাত নতুন সংকটে পড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও কর আদায়ে খানিকটা প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য মন্থর হয়ে পড়ায় স্বাভাবিকভাবেই কর আদায় কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রায় অনড় না থেকে বরং বাস্তবসম্মতভাবে বাজেট সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় এই রাজস্ব ঘাটতি বছর শেষে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।