পহেলা নভেম্বর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বিপুল ঋণ নিচ্ছে সরকার। রাজস্ব ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে অক্টোবর মাসেই ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ৬০,৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে ঝুঁকি তৈরি করছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বার্ষিক অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যার বিপরীতে চলতি বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ঘাটতি মেটাতে অক্টোবর মাসেই ব্যাংক খাত থেকে ৬০,৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।
- ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছে, যা একই সময়ে প্রাপ্ত ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার ঋণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বুধবার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে আরও ৫,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে; বর্তমানে দেশে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা বাবদ মোট ব্যয় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
পহেলা নভেম্বর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বর্ধিত বেতন প্রদান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় এই বিশাল ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের বকেয়া পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় চলতি মাসেই বিভিন্ন মেয়াদি বিলের মাধ্যমে ৬০,৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যার একটি বড় অংশই আসবে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে।
সরকারের এই ঋণ নির্ভরতার নেপথ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার পাওয়া গেলেও একই সময়ে ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রাপ্ত ঋণের চেয়ে প্রায় ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে ঋণ পরিশোধে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী জানান, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব অর্জিত না হওয়ায় সরকার বকেয়া বেতন মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়লে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে। বর্তমানে দেশে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা ও গ্র্যাচুইটি বাবদ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে গত তিন মাসে ২৩,২২৭ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বিচারে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ স্থগিত রাখা এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায়, অভ্যন্তরীণ ঋণের এই বিশাল বোঝা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।