জাপানের ওনাগাওয়া বন্দরের বাসিন্দা ইয়াসুও তাকামাতসু ২০১১ সালের ভয়াবহ সুনামিতে নিখোঁজ স্ত্রী ইউকোকে খুঁজতে গত ১৫ বছর ধরে সাগরে ডুব দিয়ে চলেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ৭৬০টিরও বেশি ডুব সম্পন্ন করেছেন। কোনো মৃতদেহ বা কবর খুঁজে না পেয়ে সাগরের অতল গভীরে স্ত্রীর সান্নিধ্য ও স্মৃতি খুঁজে ফেরেন এই জাপানি নাগরিক।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে আঘাত হানা সুনামিতে ইয়াসুও তাকামাতসুর স্ত্রী ইউকো ওনাগাওয়া শহরের একটি ব্যাংকের ছাদ থেকে ভেসে যান এবং তখন থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
- নিখোঁজ স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধারের আশায় এবং তার সঙ্গে মানসিক সংযোগ বজায় রাখতে ইয়াসুও গত ১৩ বছরের বেশি সময়ে ৭৬০টিরও বেশি সফল ডাইভ বা ডুব সম্পন্ন করেছেন।
- জাপানি উপকূলরক্ষী বাহিনীর ডুবুরিদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে পঞ্চাসের কোঠার ইয়াসুও প্রতি মাসে দুইবার ছোট মাছ ধরার নৌকায় চড়ে এই বিপজ্জনক সাগরে যাত্রা করেন।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
জাপানের উত্তর-পূর্ব মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে প্রতি মাসে দুইবার ছোট মাছ ধরার নৌকায় চড়ে সাগরে যাত্রা করেন ইয়াসুও তাকামাতসু। ২০১১ সালে জাপানে আঘাত হানা ভয়াবহ সুনামির ঢেউয়ে তার স্ত্রী ইউকো নিখোঁজ হন। সেই থেকে শুরু হয় স্ত্রীর খোঁজে তার এই ব্যতিক্রমী ও দীর্ঘ সংগ্রাম। উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাস্ক, এয়ার ট্যাংক এবং ওয়েট বেল্ট পরে ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দেন তিনি। প্রতিটি ডুবের সঙ্গেই তিনি ফিরে যান সেই সাগরে, যা এক পলকে তার প্রিয়তমাকে কেড়ে নিয়েছিল।
ঘটনার দিন সকালে ইয়াসুও তার স্ত্রীকে কর্মস্থলে নামিয়ে দিয়েছিলেন এবং রাতের খাবার কী হবে তা নিয়ে কথা বলেছিলেন। সুনামির সতর্কীকরণ সাইরেন বাজার পর ইউকো ও তার ১২ জন সহকর্মী ব্যাংকের ছাদে আশ্রয় নেন এবং শেষ বার্তা পাঠান, "তুমি কি নিরাপদ আছো? আমি বাড়ি যেতে চাই।" এরপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। পানি নেমে যাওয়ার পর হাজার হাজার মৃতদেহ উদ্ধার হলেও ইউকোর মতো অনেকেই নিখোঁজ থেকে যান। প্রথমে কোস্টগার্ডের ডুবুরিদের মৃতদেহ খুঁজতে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইয়াসুও নিজে ডাইভিং শেখেন, যা পরবর্তীতে স্মৃতির এক নিজস্ব রীতিতে পরিণত হয়।
পানির ৫০ মিটার নিচে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জলজ ভূদৃশ্যের ওপর দিয়ে সাঁতার কাটার সময় ইয়াসুওর মনে হয় তিনি স্ত্রীর আশেপাশেই আছেন। তিনি জানান, কবরে গিয়ে স্মরণ করার চেয়ে সাগরের গভীরে এই ডুব দেওয়ার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। সমুদ্রের নিচে ভাঙা গাড়ি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ এখন কৃত্রিম প্রবাল প্রাচীরে পরিণত হয়েছে, যেখানে মাছ এসে ডিম পাড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই নির্মম সত্য মেনে নিয়েও ইয়াসুও সমুদ্রকে ঘৃণা করেন না, বরং একে প্রকৃতির অবিরাম পরিবর্তনচক্রের অংশ হিসেবেই দেখেন।
১৫ বছর পরেও ইয়াসুওর মনে স্ত্রীর জন্য শোক ও ভালোবাসা অটুট রয়েছে। ৭৬৩টিরও বেশি ডুব সম্পন্ন করার পরও তার এই নিরলস প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। জাপানি সংস্কৃতির মৃতদের স্মরণের প্রথার বাইরে গিয়ে তিনি নিজের মতো করে প্রিয়জনের সান্নিধ্য খুঁজে ফেরেন। যতদিন শারীরিক সক্ষমতা থাকবে, ইউকোর কাছাকাছি থাকার এই আজব আকুতি নিয়ে তিনি বারবার সাগরের নীল অতলে ফিরে যাবেন।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।