মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় অপরিশোধিত তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ায় কৌশলগত মজুত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হলে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বেড়ে ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
- যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) থেকে ১৭ কোটি ২২ লাখ ব্যারেলসহ মোট ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মজুত কমে ২৮ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে নেমেছে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন।
- বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চীনের স্থলভাগে সংরক্ষিত তেলের মজুত কমে প্রায় ১১৩ কোটি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে শোধনাগারগুলোর প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও ভারতের হাতে মাত্র আট দিনের আমদানি চাহিদার মজুত রয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা বাড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় গত শুক্রবার লেনদেন শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালির বিভিন্ন নৌপথে একাধিক তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করায় লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি চরমে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) ৩২টি সদস্যদেশ গত ১১ মার্চ জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে কৌশলগত ও জরুরি তেলের মজুত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র একাই তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত (এসপিআর) থেকে ১ কোটি ২২ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ায় বর্তমানে তাদের মজুত কমে ২৮ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন। তবে জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) মতে, এই তেলের একটি অংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে যা পরে অতিরিক্ত তেলসহ ফেরত আসার কথা।
স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক অ্যারন কিলডোর তথ্যমতে, চীন ও ইরানকে বাদ দিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যবহারযোগ্য কার্যকর তেলের মজুত এখন প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি, যার প্রায় অর্ধেকই রয়েছে জাপানের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিউই শু জানিয়েছেন, চীনের স্থলভাগে সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ কমে ১১৩ কোটি ব্যারেলে ঠেকেছে, যা দিয়ে তাদের শোধনাগারগুলোর প্রায় ৮০ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অবস্থা বেশ নাজুক, যেখানে ভারতের হাতে রয়েছে মাত্র আট দিনের আমদানি চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত মজুত।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ যদি পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে এবং হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিদিন পরিবাহিত প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে এশিয়ার উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।