আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ গিগাওয়াটে পৌঁছালেও জ্বালানি সংকট ও সরবরাহের দুর্বলতায় বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলছে না। কাগজে-কলমে ৬৬ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন থাকলেও গ্যাস ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর ৪৮ শতাংশে নেমেছে, যা দেশের জ্বালানি খাতের বড় দুর্বলতা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- এসঅ্যান্ডপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ গিগাওয়াটে উন্নীত হলেও চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
- গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড় প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টর (PLF) ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৮ শতাংশে নেমেছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তার বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৬০ সালের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ৬২ গিগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে এবং মোট ব্যবহার ৩৬২ টেরাওয়াট ঘণ্টায় উন্নীত হতে পারে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাগজে-কলমে সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে গ্রাহকের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে দেশে প্রায় ৩০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল, যার ফলে রিজার্ভ মার্জিন বা বাড়তি সক্ষমতা দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশ। অথচ বছরের প্রথমার্ধেই বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার মূল কারণ মূলত জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা বড় হলেও তা নিয়মিত চালানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তেল এবং নিরবচ্ছিন্ন সঞ্চালনব্যবস্থা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগের ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট হলেও গত ২০ মে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাসের কারণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বা প্ল্যান্ট লোড ফ্যাক্টরেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এসঅ্যান্ডপির তথ্যমতে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর গড় পিএলএফ ৫৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৮ শতাংশে নেমেছে; অন্যদিকে ঘাটতি পূরণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পিএলএফ ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গত ৪ নভেম্বর সামিটের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক দিনে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার ঘটনাটি এই খাতের নাজুক অবস্থাকেই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চেয়েও জ্বালানি সরবরাহ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৬ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৬০ সাল নাগাদ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়ে ৬২ গিগাওয়াটে দাঁড়াতে পারে এবং মোট ব্যবহার ৩৬২ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে হলে শুধু কাগজে সক্ষমতা বাড়ানোর নীতি থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।