পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপে এক জনসভায় রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিতর্কিত মন্তব্য করে বলেছেন, ‘মা’-কে ‘আম্মা’ এবং ‘জল’-কে ‘পানি’ বলা যাবে না। তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার ভাষাপ্রেমী ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা এটিকে ধর্মীয় মেরুকরণের অপচেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপের জনসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন যে, ‘মা’-কে ‘আম্মা’ এবং ‘জল খাব’-কে ‘পানি খাব’ বলা যাবে না।
- ভাষাবিদ ও সচেতন মহলের মতে, বাংলা ভাষায় যুগ যুগ ধরে ‘জল’ ও ‘পানি’ উভয় শব্দেরই স্বতঃস্ফূর্ত সহাবস্থান রয়েছে এবং কাজী নজরুল ইসলাম থেকে জসীমউদ্দীনের সাহিত্যেও এর প্রমাণ মেলে।
- রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের অভিযোগ, বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো মূল আর্থ-সামাজিক সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে ভাষা ও ধর্মকে হাতিয়ার করে মেরুকরণের রাজনীতি করছেন শুভেন্দু অধিকারী।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কাকদ্বীপে আয়োজিত এক রাজনৈতিক জনসভায় রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ওই সমাবেশে তিনি প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মা’-কে আর ‘আম্মা’ বলা যাবে না এবং ‘জল খাব’ কখনোই ‘পানি খাব’ হতে পারে না। একই মঞ্চ থেকে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করেন এবং অতীতে মহালয়ার দিনে মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তোলার গুরুতর অভিযোগও তোলেন।
শুভেন্দু অধিকারীর এই ভাষাকেন্দ্রিক মন্তব্যের পরই দুই বাংলার ভাষাপ্রেমী, সাহিত্যিক ও সচেতন মহলে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সমালোচকদের জোরালো অভিমত, এটি নিছক কোনো ভাষার টান নয়, বরং এর পেছনে আসন্ন রাজনৈতিক ফায়দা ও ভোটব্যাংক পোক্ত করার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ ও সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল লুকিয়ে রয়েছে।
ইতিহাস ও সংস্কৃতির গবেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলা ভাষা কোনো নির্দিষ্ট একক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়। জন্মলগ্ন থেকেই এই ভাষায় সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ও দেশি শব্দের অনায়াস মিশ্রণ ঘটেছে। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন—সবার অকৃত্রিম রচনাতেই ‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দ দুটির অত্যন্ত সুন্দর ও স্বতঃস্ফূর্ত সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। এমনকি সনাতন ধর্মাচরণেও বহু অঞ্চলে ‘গঙ্গাজল’-এর পাশাপাশি ‘গঙ্গাপানি’ এবং সাধারণ আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘চোখের পানি’ শব্দবন্ধের বহুল ও স্বাভাবিক প্রচলন রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশের মতে, বর্তমান সময়ে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি কিংবা দুর্নীতির মতো জ্বলন্ত ও বাস্তব আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলো থেকে সাধারণ মানুষের নজর সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতেই ভাষা ও ধর্মকে একাকার করে ফেলার এই অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ‘জল’ ও ‘মা’ শব্দ দুটিকে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর প্রতীক এবং ‘পানি’ ও ‘আম্মা’ শব্দ দুটিকে ভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার এই প্রবণতাকে তারা বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ও সাংস্কৃতিক বিকৃতি হিসেবেই দেখছেন।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।