জলপাইগুড়ির ৫১৭ বছরের প্রাচীন বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপূজায় বিজয়া দশমীর বিশেষ রীতি হিসেবে দেবীকে পান্তা ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা এবং পুঁটি মাছের ভোগ নিবেদন করা হয়। ১৫১০ সালে রাজা বিশ্ব সিংহ এই পূজার সূচনা করেন। দশমীর সকালে কনকদুর্গার বিসর্জনের আগে এই ঐতিহ্যবাহী আহারের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় দেবীকে, যা আজও উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- ১৫১০ সালে কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহ প্রবর্তিত এই পূজা ২০২৬ সালে ৫১৭ বছরে পদার্পণ করেছে, যেখানে আজও প্রাচীন রাজকীয় প্রথা ও শাস্ত্রীয় নিয়ম কঠোরভাবে পালন করা হয়।
- বিজয়া দশমীর সকালে দেবীকে মাটির সানকিতে পান্তা ভাত, ভাজা ইলিশ, পুঁটি মাছ এবং কচুর শাকের ভোগ দেওয়া হয়, যা মূলত রাজবাড়ির কুলদেবী কনকদুর্গার বিদায়বেলার বিশেষ লোকজ রীতি।
- প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব; রাজবাড়ির নাটমন্দির থেকে কনকদুর্গার প্রতিমা সুসজ্জিত কাঠের রথে চড়িয়ে স্থানীয় রাজবাড়ির দিঘিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে বিসর্জন সম্পন্ন হয়।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ঐতিহ্যবাহী বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গাপূজা এবার ৫১৭ বছরে পা দিল। এই পূজার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ব্যতিক্রমী দিক হলো বিজয়া দশমীর বিশেষ ভোগ। শত শত বছরের রীতি মেনে দশমীর সকালে দেবী দুর্গাকে পান্তা ভাত, ভাজা ইলিশ এবং পুঁটি মাছের ভোগ নিবেদন করা হয়। কোচবিহারের রাজা বিশ্ব সিংহের হাত ধরে ১৫১০ সালে শুরু হওয়া এই পূজা আজও তার স্বকীয়তা ও রাজকীয় গাম্ভীর্য বজায় রেখেছে।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির এই পূজায় একসময় নরবলির প্রথা থাকলেও বর্তমানে তা বিলুপ্ত হয়ে ছাগল ও মোষ বলির প্রথা চালু রয়েছে। তবে পান্তা-ইলিশের ভোগ আজও অপরিহার্য অংশ হিসেবে টিকে আছে। দশমীর দিন সকালে দেবীর সামনে মাটির সানকিতে পান্তা ভাত সাজিয়ে দেওয়া হয়। সাথে থাকে তেলের কড়াইয়ে কড়া করে ভাজা ইলিশ ও পুঁটি মাছ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই সাধারণ গ্রামীণ খাবারের মাধ্যমেই ঘরের মেয়ে উমাকে বাপের বাড়ি থেকে বিদায় জানানো হয়।
পূজার আচার-অনুষ্ঠানে রাজবাড়ির বর্তমান বংশধররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দশমীর সকালে বিশেষ আরতির পর কনকদুর্গার প্রতিমা নাটমন্দির থেকে বের করা হয়। এরপর একটি বিশাল কাঠের রথে প্রতিমা স্থাপন করে রাজবাড়ির দিঘির পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শাস্ত্রীয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বিসর্জন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই উৎসব দেখতে প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কয়েক হাজার দর্শনার্থী জলপাইগুড়িতে ভিড় জমান।
৫১৭ বছরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক পূজা তার জৌলুস হারালেও বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি আজও তাদের পূর্বপুরুষদের প্রবর্তিত নিয়মগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করছে। পান্তা-ইলিশের এই ভোগ এবং রথে চড়ে বিসর্জন—সব মিলিয়ে এই পূজা পর্যটন ও লোকসংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ায় স্বীকৃত।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।