বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিরল ব্যক্তিত্ব হিসেবে দুবার নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী কিংবদন্তি বিজ্ঞানী মারি কুরির মরদেহ মৃত্যুর বহু বছর পরেও সিসার তৈরি একটি বিশেষ ও সম্পূর্ণ বদ্ধ কফিনে সমাহিত করা হয়েছিল। অতিরিক্ত মাত্রায় তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম নিয়ে দীর্ঘকাল কাজ করার কারণে তাঁর শরীর মারাত্মকভাবে তেজস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল, যা আজও অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পয়েন্ট (Key Takeaways):
- পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন—উভয় শাখায় নোবেল পুরস্কার অর্জনকারী বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র বিজ্ঞানী মারি কুরি ১৯০৩ ও ১৯১১ সালে এই অনন্য সম্মান লাভ করেছিলেন।
- তীব্র তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে তাঁর কফিনটি প্রায় এক ইঞ্চি বা আড়াই সেন্টিমিটার পুরু সিসার পাত দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়।
- তাঁর ব্যবহৃত নোটবুক, গবেষণাপত্র এবং ল্যাবরেটরি সরঞ্জামগুলো আজও ফ্রান্সের জাতীয় লাইব্রেরিতে সীসার বাক্সে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সম্পূর্ণ প্রতিবেদন
আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত মারি কুরি তাঁর জীবদ্দশায় যে অবদান রেখে গেছেন, তা মানবসভ্যতাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং পরবর্তীতে ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে অনন্য নজির স্থাপন করেন। কিন্তু এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পেছনে তাঁকে এবং তাঁর স্বামী পিয়ের কুরিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল, যার পরিণতি সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরের দাফন প্রক্রিয়ার সঙ্গে।
জীবদ্দশায় দশকের পর দশক ধরে তিনি পোলোনিয়াম এবং রেডিয়ামের মতো অত্যন্ত সক্রিয় তেজস্ক্রিয় মৌল নিয়ে কাজ করেছেন। তখন তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের সম্যক ধারণা ছিল না, ফলে কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই তিনি খালি হাতে এ নিয়ে কাজ চালিয়ে গেছেন। এর ফলে তাঁর অস্থিমজ্জা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৯৩৪ সালে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর রক্ত ও দেহে যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় কণা জমা হয়েছিল, তা পরিবেশের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
এই কারণে তাঁর মৃত্যুর পর ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা অত্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেন। সাধারণ কফিনে সমাহিত করলে তাঁর দেহাবশেষ থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে মিশে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাতে পারত। ফরাসি শহর সাক্সের একটি কবরস্থানে তাঁকে যখন সমাহিত করা হয়, তখন তাঁর কাঠের কফিনটিকে প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার বা প্রায় এক ইঞ্চি পুরু সিসার আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, যা তেজস্ক্রিয় রশ্মিকে পুরোপুরি আটকে রাখতে সক্ষম।
মারি কুরির এই ঘটনা বিজ্ঞান গবেষণায় সুরক্ষার গুরুত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর গবেষণার নোটবুকগুলো আজও এতটাই তেজস্ক্রিয় যে গবেষকদের সেগুলো দেখতে হলে বিশেষ সুরক্ষা স্যুট ও গ্লাভস পরতে হয়। বিজ্ঞান সাধনায় তাঁর এই আত্মত্যাগ কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের দ্বারই উন্মুক্ত করেনি, বরং বিজ্ঞানীদের সুরক্ষার বিষয়টিও বিশ্বজুড়ে বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
বাংলা নিউজ ২৪ জাতীয় সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসারে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর সংবাদ প্রকাশ করে। কোনো অসঙ্গতি বা তথ্য সংশোধনের জন্য আমাদের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হচ্ছে।